Skip to main content

(অ)দরকারী

অভাব, অভাব আর অভাব। এখানে কচুর লতি পাওয়া যায় না, মেটে আলু পাওয়া যায় না, বিচেকলা পাওয়া যায় না, শীষপালং পাওয়া যায় না। অভাবের দেশে যা অপ্রতুল, আন্তর্জাতীয় সমারোহে তা দুষ্প্রাপ্য, বিপন্ন। 

যেখানে পুকুরপাড় থেকে তুলে আনা কলমীশাকের সাহচর্যে লবণাক্ত ফেনাভাতের অমৃতসমান তৃপ্তি, বা খুচরো ভাজাভুজির সঙ্গতে ছাঁচিপেঁয়াজ আর পান্তাভাতের প্রশান্তি, নিদেনপক্ষে বাজরার ধোঁয়া ওঠা চাপাটির সাথে খেজুর কিংবা আখের গুড় - সেইসব বসুন্ধরা কোথায় ?

এখানে যা সহজলভ্য, তা হলো একই সব্জীর বিবিধ প্রকার। এমনকি আলু-শসা-টমেটোর মত নিরীহ জিনিসপত্রেরও। আবার কীটনাশক বিহীন (organic) হলে তার অতিরিক্ত (ক)দর। তাদের চেহারা দেখে আলাদা করা, আর বাজারের শেষ অবধি লেবেলে সাঁটা দুর্বোধ্য নাম মনে রাখা ছোটদের পত্রিকার 'অমিল খোঁজো তফাৎ বোঝো'র চেয়ে ঢের মুশকিলের। স্বোপার্জিত অর্থ - সুতরাং দায়বদ্ধতার ঘোরপ্যাঁচ নেই - সবরকমই একবার করে ঘুরিয়েফিরিয়ে পরখ করা হল। নিজের ঘ্রাণশক্তি বা স্বাদকোরকের সংবেদনশীলতা নিয়ে আমার সংশয় নেই; তাই চেখে দেখতেই বোঝা গেল এদের নামই সার। আপাতত ন্যূনতম দাম এবং চলনসই গুণমানের যুগলবন্দী বেছে নেবার তালিম চলছে। 

তবে, সংখ্যালঘু হলেও, কেউ কেউ তো মূলস্রোতের বাইরেও থেকে যায়। লঙ্কার ক্ষেত্রে ঠিক তাই হল। রাবণের রাজ্যপাট নয়, উদ্ভিজ্জ। মশলাদার (spicy) আর ঝালের (hot/tangy) মধ্যে যারা পার্থক্য বোঝার প্রয়োজন বোধ করে না, তাদের প্রতি আমার আধসেদ্ধ সমবেদনা রইল।    

এখানে স্থানীয় দোকানে বিভিন্ন রকমের লঙ্কা (pepper, chili নয়) পাওয়া যায়। নানা আয়তন ও আকৃতির, এবং লাল-সবুজ-কমলা-হলুদ-বেগুনী রঙের আকর্ষণীয় লঙ্কা, বা বলা ভালো লঙ্কা হতে চাওয়া ক্যাপসিকাম রূপিণী মশলা ও সবজির মাঝামাঝি মরিচের উপপ্রজাতি। দামও সাধ্যের মধ্যে। এদিকে তাদের প্রায় কোনোটাই স্বাদে ও গন্ধে তেমন ঝাল নয়। কয়েকটা আবার হালকা মিষ্টি। রসিকতারও একটা সীমা থাকে! এইসব দিয়ে চমৎকার ঘর সাজানো যায়, বাহারি ঝুড়ি বা ড্রিমক্যাচার - কিন্তু আসল কাজের বেলায় আস্ত মাকাল। খুব বেশী হলে শখের খাবারদাবারের ওপর নকশা করা যেতে পারতো - কিন্তু আমরা ক্ষুন্নিবৃত্তির মত সাপ্তাহিক পরমান্ন রেঁধেই যাবতীয় শুভাকাঙ্খী গুরুজনকে কত উদ্ধার করে ফেলেছি - তার ওপরে আবার শৌখিনতা। ঘরের পাশেই তো মেক্সিকো - লঙ্কার আদি জন্মভূমি - এখানে তবে এ দুর্দশা কেন? যাই হোক, আমার গৃহসঙ্গিনী অনেক খুঁজেপেতে একটা চলনসই ব্যাপার আবিষ্কার করেছে। সেরানো পেপার (Serrano pepper)।
Serrano Pepper (Wikipedia)
কাঁচা অবস্থায় দেখতে অবিকল হ্যালাপেনিওর (Jalapeño) মতো, কেবল একটু দীর্ঘাঙ্গী। তা হোক। নৃশংসভাবে ছোটো ছোটো টুকরো করে ফেলার পর কে আর চেহারার কথা মনে রাখবে! ... কিন্তু, ক'দিন যেতে না যেতেই আমার আবার সেই নঙর্থক আহ্লাদ ফিরে এসেছে। এই সেরানো বড্ড মোটাসোটা, কেমন আঁচলে হলুদের দাগ লেগে থাকা মাঝবয়
সী গিন্নিবান্নি ধরণের - অন্যদের ভবিষ্যৎ আর টিফিনকৌটো পরিপাটি করে গুছিয়ে দেওয়া ছাড়া যার হয়তো আর কোনো সম্ভাবনা নেই। আর উপমহাদেশের সেইসব হরিৎবর্ণা তন্বী - সেই কোনকালে অতলান্তিক পার হয়ে দুই মহাদেশের হাত ধরে ভারতভূমিতে যার আবির্ভাব ... তারপর সহস্রাব্দ ধরে সেখানকার জলহাওয়ায়, অনাত্মীয়ের আতিথেয়তায় স্বতন্ত্র আঙ্গিকে বেড়ে ওঠা। পরিযায়ী ও প্রবাসীর তত্ত্ব তখন অপরিকল্পিত। কাঁচা-পাকা-সেদ্ধ-পোড়া এমনকি মরণোত্তর সম্মানের মতো ক্রান্তীয় রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে তার বহুমুখী ব্যবহার। মশলা হিসেবে অপাংক্তেয় না থেকে খাদ্যবস্তুর চরিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন আদলে ফিরে ফিরে আসা। পদমর্যাদা। মাছের ঝোল আর ফুচকায় কেউ কোনোকালে একইরকম লঙ্কার উপস্থিতি আশা করেছে? নেহাতই বেরসিক না হলে? কিংবা লঙ্কার আচার? যাকে আঞ্চলিকতার অন্ধ গর্বে খোট্টাদের সংস্কৃতি বলে উপেক্ষা করতে চাইলেও শেষমেশ ময়দানবীয় ঝালমুড়ি ও অন্যান্য জনপ্রিয় খাদ্যে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সে তুলনায় pickled Jalapeño নিতান্ত শিক্ষানবিশ।।
ভারতীয় লঙ্কা
সেকালে অবস্থাপন্ন পরিবারে গ্রামগঞ্জ থেকে আসা অভাবী মানুষ ভরণপোষণের বিনিময়ে ফাইফরমাস খাটতো, হাসিমুখে কচিকাঁচাদের আবদার সামলাতো, আর এইভাবেই একসময়ে সে বাড়ীর একজন হয়ে উঠতো। হিন্দুস্তানীয় খামারে তেমন ভাবেই স্থান করে নিয়েছে লঙ্কার জ্বলন্ত সুবাস। প্রসঙ্গত, গোলমরিচ (Black pepper) সনাতনী ভারতবর্ষের নিজস্ব উৎপাদন হয়েও মনমোহিনী লঙ্কার কাছে হেরে গিয়েছিল বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায়। আজকাল গোলমরিচের স্থান মূলত স্যুপ বা অন্যান্য বিদেশী খাবারে। পাশ্চাত্যের প্রতি আমাদের যে দুর্নিবার টান, সে তো বিশ্বায়নের হুজুগ নয়। ঐতিহ্যের মতো প্রাচীন।


বিজ্ঞানের সত্যান্বেষণ বা শিল্পকলার লালিত্যকে অতিক্রম করে কখনো কখনো বস্তুবাদী বাণিজ্য সভ্যতার ইতিহাসের দিকনির্ণায়ক হয়ে ওঠে। ম্যাপলের পাতায় রক্তিম বাদামী লজ্জারুণ ফুরিয়ে যাবার আগে, তুষারপাতের সফেন বৈরাগ্যে সংসার নিশ্চল হয়ে যাবার আগে সময়সুযোগ করে একবার বাংলাদেশী বা ভারতীয় শস্যভাণ্ডারে সশস্ত্র হানা দেওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে। 

Comments

Popular posts from this blog

পেশা : এক অপদার্থের কাহিনী

ছোটো থেকেই আমি বেশ কর্মবীর । জন্মেছি যখন কিছু তো একটা করে যেতে হবে - একথাটা ভেতরে শেকড় গেড়ে বসেছিল। ওই বয়সে সমাজের জীবিকাভিত্তিক শ্রেণী ও বর্ণভেদের ধারণা তৈরী হয়না , ফলে নির্বাচনে কোনো বাঁধন ছিল না। মা ' কে রসিয়ে রসিয়ে শোনাতাম সেইসব জল্পনার কথা। মায়েরা চিরকাল শিশুসন্তানের অসংলগ্ন কথাকে অতিমানবিক প্রতিভার স্ফূরণ বলে ভুল করে এসেছে। তাই দিব্যি ছিলাম। সময়ের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী পেশার মোটামুটি দুরকম ভাগ। কিছু স্বপ্ন থাকে নেপথ্যে , অনেকবছর ধরে বাঁচে । বাদবাকি যা হয় , ওই মরসুমি শাকসবজির মত। একে একে বলা যাক। পাড়ার মুড়ি - চিঁড়ের দোকান। খইবাতাসা - ছোলাবাদাম - নকুলদানা এসবের সঙ্গে একটা গোটা তাক জুড়ে থরে থরে সাজানো চানাচুর - ঝুরিভাজার বয়াম। বিবিধ রূপরসবর্ণ ও স্বাদের। ভাজাভুজি বা মশলাদার খাবারে তখন নিষেধাজ্ঞা। ফলে মায়ের কাছে কাতর ঘ্যানঘ্যান করে কোনো লাভ হত না। এদিকে রবীন্দ্রভারতী থেকে ফেরবার সময় অনেক পড়ুয়াই (আ মার চেয়ে মাত্র বিশবছরের বড় !) অক্লেশে ওইসব দুর্লভ খাদ্যদ্রব্য কিনে নিয়ে যেত। অতঃপর , অসহায়  আমি সিদ্ধান্ত নিলাম , বড় হয়ে শুধু চানাচুর - ঝুরিভাজারই দোকান দেব ( হলদিরামের ...

আলু-থালু

মেয়েটিকে একলা দেখে প্রৌঢ়া সহযাত্রিণী শুধোলেন, তাঁদের পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার ভাগ করে খেতে তার কোনো আপত্তি আছে কীনা। বাড়ী থেকে বানিয়ে আনা গরম খাবার, একেবারেই সাদামাটা; তবে সঙ্গে বাচ্চা ও বয়স্ক মানুষ আছে- তারা প্যান্ট্রির হাবিজাবি খেতে পারেনা। আর স্টেশনে দাঁড়ালেই খুচরো ভাজাভুজি মুখরোচক যা বিক্রি করতে আসে তার গুণমান তো কহতব্য নয়। একা মানুষের অবশ্য রান্না করে আনা ভারী ঝক্কি।    এর আগে মেয়েটিকে নিয়ে একপ্রস্থ আলোচনা হয়েছে ট্রেনের কুপে। ঢলঢলে টিশার্ট আর অনেকগুলো পকেটওয়ালা প্যান্ট, উবুঝুঁটি, মশমশে কেডস, ঢাউস ব্যাগপত্তর, তার ওপর এই দেড়দিনের দীর্ঘ যাত্রায় সঙ্গীহীন - এমন অসৈরণ ব্যাপার তাঁদের ছেলেবেলায় দেখা যেত না। আধুনিক না ছাই! ভয়ডর নেই মনে - সংস্কারের ঘটশ্রাদ্ধ করে ছেড়েছে। আর খাবারেরও বলিহারি - কীসব বার্গার-চিপ্স-আলুভাজা হ্যানাত্যানা! এইজন্যই অমন ঘাড়েগর্দানে একাকার। মেয়েমানুষ নয় একটু ভারী চেহারা হওয়া ভালো, তা বলে এতটা! মেয়েটি হেডফোনের আড়াল থেকে গুঞ্জনের আভাস পেয়েছে, আর করুণায় হেসেছে। সনাতনী আর সেকেলের মধ্যেকার কয়েক যোজন দূরত্ব যারা দেখতে পায়নি, তাদের অভিধ...

আলোকমঞ্জীর

।১। বিনোদিনীর ঘুম ভাঙে ভোরবেলায়। ছোট্টবেলাকার অভ্যেস। গেরামে বেড়ে উঠলে যেমনটি হয়। সেই যে গো, গাঁয়ের নামটি অঞ্জনা আর নদীর নামটি খঞ্জনা। ভাদ্দরমাস পেরোল কি পেরোল না, সেখেনে ভোরের দিকে হিম পড়ে। আর সারারাত ধরে টুপটাপ ঝরে পড়ে শিউলি। তার বুকের কাছটা ভোরের সুয্যির মত টকটকে কমলা। এতো সন কেটে গেল, সেই শিরশিরে হাওয়াটুকু রয়ে গেছে অমলিন। আর আছে বালিকাবেলার কড়ি ও কোমল। বিনোদিনী, আর তার শিউলিফুল পাতানো সই, স্নেহলতা। তাদের কোঁচড় ভর্তি শিশিরভেজা ফুল। ঘাটের কাছে ছলাৎ ছল, গল্প বলে নদীর জল। এমনি সময় নাম না জানা কোনো পাখি ডেকে উঠলেই বিনোদিনীর অবুঝ  মন  উথালপাথাল করে ওঠে...  ।২। নতুন পাড়ায় আসার পর  থেকে ভাবনার একটাও বন্ধু হয়নি। উফ, এরা আবার কীনা পাড়াকে বলে সোসাইটি। ভাবনা ওদের চেয়ে ঢের বেশী ইংলিশ স্টোরিজ পড়ে, তাই বলে কি ওরকম থেমে থেমে বেঙ্গলি বলে? এমা, না না, বেঙ্গলি না, বাংলা। ওদের পাশের ফ্ল্যাটের দিদুন কেমন মিষ্টি মিষ্টি বাংলা বলে, ওর মা তো অমনি বলে না। দিদুন বলে কিনা, মা তোমার ...

খুকির প্রত্যাবর্তন, ও ধন্যবাদগাথা

সেই সময়ের কথা। যখন পাশের পাড়াকে মনে হত পৃথিবীর শেষ প্রান্ত, আর মাসিক পত্রিকার শিশুবিভাগে কাঁচাহাতের গল্প-কবিতা লিখে পাঠাবার সময় বাদামী খামের বাঁদিকে গোটা গোটা অক্ষরে লিখতাম "প্রযত্নে.. বাবার নাম"। যখন যাবতীয় সৃষ্টিশীল শিল্পচর্চার বিপরীতে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে মনে হত গম্ভীর প্রাণহীন ব্যাপারস্যাপার; অন্যদিকে কল্পবিজ্ঞান আর খবরের কাগজে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা পড়ে রুশদেশী উপকথার অজানি-দেশের-না-জানি-কী এর মত অদ্ভুত ঘোরলাগা রোমাঞ্চ হত। তালগোল পাকিয়ে যেত সব। যখন বিদেশ মানে আমার কাছে বাংলার বাইরের সমগ্র বিশ্ব - কোনোকালেই যার ধারেকাছে পৌঁছানো হবে না আমার। এইসব ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে যখন শীতের নিস্তব্ধ দুপুর বা গরমের ভ্যাপসা বিকেলে স্কুলের বারান্দায়-পার্কের মাঠে এমনকি জনবহুল বাজারহাটেও কেমন করে যেন নিজের মধ্যে ভীষণভাবে একা হয়ে যেতাম। অন্তরীপের মত।  তারপর, জীবন গিয়েছে চলে একটি দশক পার। যেসব মানুষের সাথে প্রতিদিন কথাবার্তা হয়, যাদের ওপর আমার দৈনন্দিন যাপন অনেকখানি নির্ভর করে থাকে, সেইসব মুখ বদলেছে। নতুন মুখের ভিড়ে ছোট্ট...

হে সই-সব,

আমিও যে কোনোকালে শিশু ছিলাম, আর প্রতিটি দিন বাঙ্ময় শিশুদিবস ছিল, তার প্রমাণ এই নিম্নোল্লিখিত 'কবিতা'গুচ্ছ।  জীবনবিমার কোম্পানি প্রতি বছর একটা করে ডাইরি দিত, কীজানি কার বারোমাস্যা লিখবার প্রেরণা। তার পাতায় পাতায় রীতিমত তারিখ দিয়ে, চার-পাঁচ লাইন জুড়ে জুড়ে ঈগলের ঠ্যাঙের মত হাতের লেখায় আমি হিজিবিজি জমিয়ে রাখতাম। আবার ভাবতুম পেন্সিলের কোম্পানির নাম কেন বেছে বেছে অপ্সরা বা নটরাজ হয়, আর খাতার কোম্পানি গুডবয়। তখন ধারণা ছিল, পৃথিবীর (একেবারে বিশ্বস্তরে না ভাবলে ঠিক সেই গুরুত্বটা অনুধাবন করা মুশকিল হয়ে যেত) স-ম-স্ত কবিতাই আট পংক্তির। ফলতঃ, সেই সাড়ে চার বছর বয়সে মৌলিক কিছু একটা লেখবার চেষ্টা করে দেখা গেল, "উঠল বাউল সকালেতে একতারাটি নিয়ে, একতারাটি পরের দিনই হায়রে, ভেঙে গিয়ে সে ভাঙা মনে কাঁদতে গেল বনের ধারে গিয়ে- " ছ'লাইনের বেশী এগোল না। এর পরে কী হওয়া উচিৎ কিছুতেই বুঝতে পারলাম না। আমার লেখা প্রথম 'কবিতা' একটি সার্থক ছোটগল্প হতে হতেও হল না।   এর পরেরটা সম্ভবত সদ্য উপেন্দ্রকিশোর পড়বার ফল। প্রথম শ্রেণীতে পড়তে বাংলা আর ইংরেজি ক্ল...

টাঙলা

বাংলা শব্দে গোলগাল একটা ব্যাপার আছে। যেমন অক্ষর, তেমনি ধ্বনি। মাত্রা টেনে বর্ণমালা গাঁথবার রীতি দেবনাগরীতেই ছিল। কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত তীক্ষ্ণতার বদলে বাংলা অক্ষরে যা আছে তা হল কোমলতা, স্নিগ্ধতা, শান্ত নিবিড় একটা ভাব। শাপলার ডাঁটা, ফলসার থোক, শালিধানের চিঁড়ে বা কুবোপাখির ডাক ভাবলে যেমনটা হয়। সংস্কৃত শব্দে যুক্তাক্ষরের ঝঙ্কারে আভিজাত্য আছে, দৃপ্ত গৌরব আছে, প্রচ্ছন্ন অহংও বুঝি আছে। বাংলায় সেই যুক্তবর্ণকে বেণীপুতুলের মত-মেটে কুঁজোর মত-কেঠো ঘোড়ার মত গড়েপিটে-ছেঁচে-ডেবে নেওয়া হয়েছে; যাতে ধার কম, স্বরের আধার বেশী। তাই ব-ম-য-ফলায় (যেমন- নিঃস্ব, পদ্ম, সখ্য ইত্যাদি) স্বতন্ত্র বর্ণের আঘাতের বদলে দ্বিত্বব্যঞ্জনে জিভকে আরাম দেবার একটা আলসে চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। আলসে অবশ্য কোঠাবাড়ির ছাদেরও হয়, যেখানে নুনহলুদ ছোপ ফুলছাপা শাড়ির পাশে আচারের বয়াম ঝিমোয়। যেমন অক্ষর, তেমনি ধ্বনি। এঁটেল মাটির মত ভিজে ভিজে, হেঁটে গেলে যাতে পদচিহ্ন পড়ে। তার ওপর দিয়ে ধুলো উড়িয়ে টগবগিয়ে ঘোড়সওয়ার যায় না, পদাতিক কাহারের কাঁধে পালকি যায় দুলকি চালে। তা বলে কি একেবারেই তেজ ন...

ফেরা

সাতদিনের মেয়াদ শেষ। যে পথটুকু দিব্যি হেঁটে যাওয়া যায় , গত কয়েকদিন ব্যাঙ্ক ইত্যাদিতে অনায়াসে হেঁটে হেঁটেই যাতায়াত করেছি , আর অর্ধদশক আগেও নিজের ওজনের সমান বইপত্র পিঠে নিয়ে ইস্কুলে গিয়েছি - সেইটুকু রাস্তার জন্যেও রিকশা ভাড়া করা হয়। সঙ্গে সেই ছোটো দুটো ব্যাগ। আমি সারারাস্তা অনর্গল কথা বলে যাই। মা আর রিকশাচালক চুপচাপ শোনার ভান করে। ওই বিহারী ফুচকাওলার মাখার হাত ভালো অথচ কম দেয় - এই গলি দিয়ে কেমিস্ট্রি স্যারের বাড়ী পড়তে যেতাম - সেই জলাজমি, যেখানে বাবাদের ছাত্রাবস্থায় ( নকশাল আমলে ) জনসাধারণের মধ্যে ত্রাসসঞ্চার করতে মানুষের কাটা মাথা নিয়ে ফুটবল খেলা হত বলে শুনে এসেছি - ওইদিকে পৌলমীদিদিদের বাড়ী, যাদের রমরমা পৈতৃক ব্যবসার কারখানা অন্যায়ভাবে জবরদখল হয়ে গিয়েছিল এই রাস্তা চওড়া করবার সময় - ও -- ই গলিতে সেই সাইবার কাফে, যেখানে আমি কলেজে ভর্তির সময় থেকে স্কলারশিপের আবেদন করা পর্যন্ত নির্লজ্জের মত অসময়ে এসে এসে জ্বালাতন করেছি - এইসব। এর মধ্যেই রিকশা গন্তব্যস্থলে পৌঁছয়। পরিস্থিতির সুযোগ বুঝে রিকশাওলা খুচরো ফেরত দিতে অস্বীকার করে। বাবা প্রায় রিকশার গতিতেই হাঁটে , ফলে দু - এক মিনিটের...

বন্দেমাতরম

আদিকাল থেকে যেসকল ধর্মচর্চা বিবর্তনের অলিগলি আর মহাসড়ক পেরিয়ে আজও বেঁচেবর্তে আছে, তার মধ্যে অন্যতম হিন্দুধর্ম। কোনো মহামান্য প্রচারকের মতবাদ ও বাণীর ঊর্ধ্বে নেহাতই দৈনন্দিন অভ্যাসে গড়ে ওঠা সনাতনী সংস্কার, যাকে পরবর্তীকালে একাধিক বিরুদ্ধ ও সংশোধিত ধর্মাধর্মের পাশাপাশি খানিক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই 'ধর্ম' হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত মহাদেশেই নদীমাতৃক প্রাচীন সভ্যতায় পঞ্চভূতের আরাধনার রীতি ছিল। আর ছিল গুণ ও ঋপুর একনিষ্ঠ তপস্যা। একান্তই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিজাত বিশ্বাস, তা থেকে সংগঠিত নিয়মনীতি। নিজেদের অসাধ্য যা কিছু, তা-ই অতিপ্রাকৃত, দৈব। তবু, বিমূর্ত ও অখন্ড ধারণাকে সহজবোধ্য করতে যখন ঈশ্বরের দরবারেও শ্রমবিভাজন হল, আর তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরী হল সাকার সঙ্কেত, কল্পনার যাবতীয় স্পর্ধায় ভিড় করে এল মানুষ ও অন্যান্য পশুপাখির আদল। উপাসনার নামে শুরু হল গভীর আত্মবীক্ষণ। নিজের সামর্থ্যের পরিধি বিশ্লেষণের অনন্তযাত্রা। প্রজ্ঞা আর চেতনার আলো সেই উন্নয়নের পথে একমদ্বিতীয় হাতিয়ার। আশ্চর্য্যের বিষয়, প্রায় সমস্ত পিতৃতান্ত্রিক সমাজেই প্রকৃতির পাশাপাশি জ্ঞান ও শিল্পকলার প্র...

শেষবারের মতো

অ - নে - ক দিন পরে।    হাওড়া স্টেশনে ট্রেন ঢুকবে কিছুক্ষণের মধ্যে। সাঁতরাগাছি পেরোনোর পরেই সকলের একটু একটু করে মালপত্র নামাবার ব্যস্ততা। আমার দুটো মাত্র ছোটো ছোটো ব্যাগ , তাই মটকা মেরে পড়ে থাকব। নীচের বার্থ হলে পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাব , অন্ধকারের ঘনত্ব থেকে বুঝে নেব ট্রেন কত লেট ( ঠিকঠাক সময়ে চললে সে ট্রেন অন্তত ভারতীয় নয় ) । লোকজন সারি বেঁধে দরজার কাছে জড়ো হতে থাকবে। যাদের সঙ্গে জিনিস বেশী তাদের উৎকণ্ঠাও বেশী। দূরপাল্লার ট্রেন সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যাটফর্মেই আসে , তাই প্ল্যাটফর্মের নম্বর আন্দাজ করতে পারার বাহাদুরি এখানে খাটবে না। ট্রেনের এক একটা কামরা প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে থাকবে , আ র দক্ষ অভিজ্ঞ মালবাহীরা লাফ দিয়ে উঠেই দরদাম করতে শুরু করে দেবে। দু - পাঁচ টাকা নিয়েও দর হবে   বোধহয়।  শিল্প যত সূক্ষ্ম হয় ততই তার কদর বেশী ।   আমিও এর মধ্যে চোখটোখ কচলে উঠে বসব। অত রাতে " মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি"   এইসব ভেবেটেবে মন ভালো হয়ে যাবে।    সকলে যখন সমস্ত মালপত্রের সঙ্গে দলের বাদবাকিদের গুনে নিতে ব্যস্ত , ট্রেন থেকে নেমে আমি চলমা...