Skip to main content

ফেরা

সাতদিনের মেয়াদ শেষ।

যে পথটুকু দিব্যি হেঁটে যাওয়া যায়, গত কয়েকদিন ব্যাঙ্ক ইত্যাদিতে অনায়াসে হেঁটে হেঁটেই যাতায়াত করেছি, আর অর্ধদশক আগেও নিজের ওজনের সমান বইপত্র পিঠে নিয়ে ইস্কুলে গিয়েছি- সেইটুকু রাস্তার জন্যেও রিকশা ভাড়া করা হয়। সঙ্গে সেই ছোটো দুটো ব্যাগ।

আমি সারারাস্তা অনর্গল কথা বলে যাই। মা আর রিকশাচালক চুপচাপ শোনার ভান করে। ওই বিহারী ফুচকাওলার মাখার হাত ভালো অথচ কম দেয়- এই গলি দিয়ে কেমিস্ট্রি স্যারের বাড়ী পড়তে যেতাম- সেই জলাজমি, যেখানে বাবাদের ছাত্রাবস্থায় (নকশাল আমলে) জনসাধারণের মধ্যে ত্রাসসঞ্চার করতে মানুষের কাটা মাথা নিয়ে ফুটবল খেলা হত বলে শুনে এসেছি- ওইদিকে পৌলমীদিদিদের বাড়ী, যাদের রমরমা পৈতৃক ব্যবসার কারখানা অন্যায়ভাবে জবরদখল হয়ে গিয়েছিল এই রাস্তা চওড়া করবার সময়- --ই গলিতে সেই সাইবার কাফে, যেখানে আমি কলেজে ভর্তির সময় থেকে স্কলারশিপের আবেদন করা পর্যন্ত নির্লজ্জের মত অসময়ে এসে এসে জ্বালাতন করেছি - এইসব। এর মধ্যেই রিকশা গন্তব্যস্থলে পৌঁছয়।

পরিস্থিতির সুযোগ বুঝে রিকশাওলা খুচরো ফেরত দিতে অস্বীকার করে। বাবা প্রায় রিকশার গতিতেই হাঁটে, ফলে দু-এক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যায়। তাড়াহুড়োয় সততা এবং ন্যায্য ভাড়ায় রিকশা চালানোর গুণাগুণ নিয়ে মা'র তর্ক করা হয় না। .. আমি ততক্ষণে বড়োরাস্তা পার হয়ে গেছি। বাস চলে গেলে মুশকিল। ট্যাক্সি-ক্যাব এই জাতীয় নিঃসঙ্গ যানবাহনে আমার প্রবল অনীহা।

যখন যে বাস দরকার কিছুতেই তা আসবে না, বা বিস্ফোরণের ঠিক আগের অবস্থায় ভর্তি হয়ে আসবে - এটাই রীতি। চাহিদা আর যোগানের অনুপাতের ওপর বাজারের স্থায়িত্ব প্রভৃতি নিয়ে ভেবেটেবে নিজেকে নিরুদ্বেগ রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করি। পাশের তেলেভাজার দোকানে কত সস্তায় জলখাবার পাওয়া যায় - পেছনের সরকারী আবাসনে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা কী অকল্পনীয় কম ভাড়ায় থাকেন - এমনকি বাসভাড়াও কয়েকবছরে তেমন একটা বাড়েনি - এসব নিষ্প্রয়োজন গ্রাম্ভারী চিন্তাভাবনা করতে করতে বাস এসে যায়। পিঠেহাতে ব্যাগ বওয়া আমার ট্র্যাপিজ খেলোয়াড়ের দক্ষতায় বাসে ওঠা দেখে কন্ডাক্টর হকচকিয়ে গিয়ে "আস্তে"-র পর "লেডীজ" বলতে ভুলে যায়। আমি একেবারে সামনে, বাসচালক আর ইঞ্জিনের বাঁদিকে গিয়ে বসি। শেষ অবধি যাব, এখানে কেউ গোলমাল করবার নেই।

বাসের গতিপথ আমার পরিচিত। সত্তরোর্ধ্ব প্রৌঢ়ার মত স্মৃতিচারণ করতে করতে যাই। স্মৃতি হবার মত যথেষ্ট অতীত হয়নি সেইসব ঘটনা। বিএসএনএলের দপ্তর, যেখানে কোনো জরুরী দরকারে এসে কর্মচারীরা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় এক ঘন্টা বেশীক্ষণ ধরে মধ্যাহ্নভোজ করার দরুণ আমাকে সমস্ত তলায় বিভ্রান্তভাবে ঘুরে ঘুরে লোকজনকে তাগাদা দিতে হয়েছিল -- টালা ব্রীজে ওঠার একটু আগে বিটি রোড থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া রাস্তা, যেখান দিয়ে যানজটের ঝক্কি এড়িয়ে আমরা দীঘা যাবার জন্য কাকভোরে শালিমারে পৌঁছেছিলাম (আর ফেরার দিন নন্দীগ্রামে অবরোধ হয়েছিল) -- বাটার জুতোর দোকান, যেখান থেকে পুজোয় স্টিলেটো পরে বেড়াতে বেরনো সহপাঠিনীরা মনমত হাওয়াই চটি কিনতে গিয়ে ঠাকুর দেখার সময় করে উঠতে পারেনি -- গোলবাড়ির শাখাপ্রশাখাহীন দোকানের কিংবদন্তী পরোটা কষামাংস .. এইরকম নগণ্য বিচ্ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহ।

শ্যামবাজার-হাতিবাগান এসে পড়লেই এত কিছু ভাবার ফুরসত থাকে না। গৃহস্থালির উপকরণ থেকে নিছক শৌখিন জিনিসপত্র ইত্যাদির বিকিকিনিতে কোলাহলমুখর ব্যস্ত জনজোয়ারের ফাঁক দিয়ে একবারের জন্য পাঁচ নম্বর ট্রাম ডিপো, স্টার থিয়েটার আর মোহনবাগান ক্লাবের গলি দেখে নিই। এ অঞ্চল পদাতিকের সাম্রাজ্য, তাই সমস্ত গাড়ী ও তার চালক বিশ্রাম নিতে নিতে যায়। কন্ডাক্টর নিশ্চিন্তে কালিঝুলিমাখা বোতল নিয়ে রাস্তার কলে জল ভরতে যায়আর ফিরে এসে জানলা দিয়ে আমার বাঁদিকের ছোট্ট তক্তায় সেগুলো রেখে দিতে বলে। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বাস বেথুন স্কুলচত্বর আর বিবেকানন্দ ভবন পেরিয়ে যায়।

ব্রাহ্মসমাজের সদর দপ্তর আসার আগেই বিবেকানন্দ রোড হয়ে বাস রামমোহন সরণিতে বাঁক নেয়। একবছরেরও বেশী সময় ধরে নাকি বিদ্যাসাগর কলেজের সামনের রাস্তায় উন্নয়নশীল কাজকর্ম চলছে। যা হোক, বাংলার নবজাগরণে প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষদের অবদান ও তাঁদের নামাঙ্কিত প্রতিষ্ঠানসমূহের বর্তমান অবস্থার কথা ভাবতে ভাবতে ভারাক্রান্ত হয়ে যাই। ওষুধের প্যাকেটটা যে এবারেও ফেলে এসেছি - মা সেকথা মনে করিয়ে দেওয়ায় আবার লৌকিক জগতে ফিরে আসি। ইতিমধ্যে বাস মহাত্মা গান্ধী রোডে (শহরের একমাত্র রাস্তা যার পরিবর্তিত নাম আমি মনে রাখতে পারি) এসে গিয়েছে।

আমি আবার স্মৃতিচারণায় ফিরে যাই। তিনবছরের, জীবনের অন্যতম সেরা সময়ের স্মৃতি। দুটাকা বাঁচিয়ে অর্ধেক বাসস্টপ আগে নামার, বাইশ টাকায় ভরপেট সবজি-ভাত খাবার, একপ্লেট চাউমিন দুজনে ভাগ করে খেতে চাওয়ায় কেবিন থেকে বের করে দেবার অমূল্য স্মৃতি। আরেকটু বাঁদিকে গেলেই স্বর্গ। বইপাড়া। সামনে যানজটে ফেঁসে গেলে ট্রেন ধরতে পারব কিনা- এইসব সংসারী চিন্তায় নিজেকে উৎসর্গ করে সংযত থাকার চেষ্টা করি। তবু, সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের মোড় পেরনোর আগে অবধি একটা অলস আচ্ছন্নতা ঘিরে থাকে। সময় সাশ্রয়ী মেট্রো, না বাস-ট্রেন-ট্রামের অভিজ্ঞতাসম্ভার - এর যুতসই হিসাব করে উঠতে পেরেছিলাম কিনা সেটা অমীমাংসিত থেকে যায়।

তারপর আর কী, বড়বাজারের বিখ্যাত যানজট – আবারও সেই পথচারী আর রাস্তার পাশের ছোটো অস্থায়ী দোকানপাটের প্রতাপ। হাতঘড়ির দিকে ঘনঘন চোখ চলে যায়। বাসচালক নির্বিকার বিড়ি ধরায়আর সাদাকালো ছায়াছবির ফুল-পাখি-চাঁদ-বসন্তের গান শোনে।

হাওড়া ব্রীজের আলো ঝলমলে শৃঙ্গ চোখে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। আজন্ম সালকিয়ায় বড়মাসির বাড়ী আসবার সময় হাওড়া ব্রীজ দেখে প্রায় পৌঁছে যাবার যে ছটফটে আনন্দ হত, তেমনটা নয়। শৈল্পিক প্রযুক্তিতে শৈশবের সে স্তব্ধবাক বিস্ময়ও এখন আর নেই। কিন্তু কিছু একটা ঘটে যায়, ফলে বাকি রাস্তাটুকুতে মস্তিষ্কে তথ্যপ্রেরণ স্থগিত থাকে।

বাস থামার পর, শেষ স্টপ জেনেও লোকজন ধাক্কাধাক্কি করে নেমে গেলে; পাতিলেবু-ছিটের জামা-সান্ধ্য পত্রিকা-মাটির খেলনায় সাজানো আর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আবর্জনায় পূতিগন্ধময় সাবওয়ে দিয়ে প্রতিকূল জনস্রোত ঠেলে স্টেশনে ঢুকি। বাবা প্ল্যাটফর্ম টিকিট কাটতে যায়। সঙ্গে দেওয়া আগামী দেড়দিনের বিচিত্র আহার্য্যের থলে সামলে রাখে মা।

পরিচিত ট্রেনের নাম আর আগমনবাণী শুনে স্বস্তি আসে। মস্তিষ্কে চলাচল শুরু হয়। ব্যাগপত্র সামলে নিত্যযাত্রীর মত অনাবিল আবেগহীনতায় ঘোষিত প্ল্যাটফর্মের দিকে রওনা দিই। ঘরে ফেরার পালা। কাজ পড়ে আছে অনেক।

অভ্যাস বড়ো দায়। অন্যের রাজ্যপাট আজকাল আপন মনে হয়। সবই তো ঘর। প্রবাস বলে কিছু হয় না।

Comments

Popular posts from this blog

হে সই-সব,

আমিও যে কোনোকালে শিশু ছিলাম, আর প্রতিটি দিন বাঙ্ময় শিশুদিবস ছিল, তার প্রমাণ এই নিম্নোল্লিখিত 'কবিতা'গুচ্ছ।  জীবনবিমার কোম্পানি প্রতি বছর একটা করে ডাইরি দিত, কীজানি কার বারোমাস্যা লিখবার প্রেরণা। তার পাতায় পাতায় রীতিমত তারিখ দিয়ে, চার-পাঁচ লাইন জুড়ে জুড়ে ঈগলের ঠ্যাঙের মত হাতের লেখায় আমি হিজিবিজি জমিয়ে রাখতাম। আবার ভাবতুম পেন্সিলের কোম্পানির নাম কেন বেছে বেছে অপ্সরা বা নটরাজ হয়, আর খাতার কোম্পানি গুডবয়। তখন ধারণা ছিল, পৃথিবীর (একেবারে বিশ্বস্তরে না ভাবলে ঠিক সেই গুরুত্বটা অনুধাবন করা মুশকিল হয়ে যেত) স-ম-স্ত কবিতাই আট পংক্তির। ফলতঃ, সেই সাড়ে চার বছর বয়সে মৌলিক কিছু একটা লেখবার চেষ্টা করে দেখা গেল, "উঠল বাউল সকালেতে একতারাটি নিয়ে, একতারাটি পরের দিনই হায়রে, ভেঙে গিয়ে সে ভাঙা মনে কাঁদতে গেল বনের ধারে গিয়ে- " ছ'লাইনের বেশী এগোল না। এর পরে কী হওয়া উচিৎ কিছুতেই বুঝতে পারলাম না। আমার লেখা প্রথম 'কবিতা' একটি সার্থক ছোটগল্প হতে হতেও হল না।   এর পরেরটা সম্ভবত সদ্য উপেন্দ্রকিশোর পড়বার ফল। প্রথম শ্রেণীতে পড়তে বাংলা আর ইংরেজি ক্ল...

খুকির প্রত্যাবর্তন, ও ধন্যবাদগাথা

সেই সময়ের কথা। যখন পাশের পাড়াকে মনে হত পৃথিবীর শেষ প্রান্ত, আর মাসিক পত্রিকার শিশুবিভাগে কাঁচাহাতের গল্প-কবিতা লিখে পাঠাবার সময় বাদামী খামের বাঁদিকে গোটা গোটা অক্ষরে লিখতাম "প্রযত্নে.. বাবার নাম"। যখন যাবতীয় সৃষ্টিশীল শিল্পচর্চার বিপরীতে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে মনে হত গম্ভীর প্রাণহীন ব্যাপারস্যাপার; অন্যদিকে কল্পবিজ্ঞান আর খবরের কাগজে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা পড়ে রুশদেশী উপকথার অজানি-দেশের-না-জানি-কী এর মত অদ্ভুত ঘোরলাগা রোমাঞ্চ হত। তালগোল পাকিয়ে যেত সব। যখন বিদেশ মানে আমার কাছে বাংলার বাইরের সমগ্র বিশ্ব - কোনোকালেই যার ধারেকাছে পৌঁছানো হবে না আমার। এইসব ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে যখন শীতের নিস্তব্ধ দুপুর বা গরমের ভ্যাপসা বিকেলে স্কুলের বারান্দায়-পার্কের মাঠে এমনকি জনবহুল বাজারহাটেও কেমন করে যেন নিজের মধ্যে ভীষণভাবে একা হয়ে যেতাম। অন্তরীপের মত।  তারপর, জীবন গিয়েছে চলে একটি দশক পার। যেসব মানুষের সাথে প্রতিদিন কথাবার্তা হয়, যাদের ওপর আমার দৈনন্দিন যাপন অনেকখানি নির্ভর করে থাকে, সেইসব মুখ বদলেছে। নতুন মুখের ভিড়ে ছোট্ট...

ল্যাদকথন: একটি শনিবাসরীয় চলভাষালাপ

[সময়কাল ও স্থান: অপ্রাসঙ্গিক। ল্যাদ স্থানকালাতীত।]  আমি: হ্যাঁ বলো। মা: কী করছিস? আমি এই একটু দুধচা করলাম, চিনিছাড়া। [স্লা......র্প]  (রোজ এইভাবেই কথোপকথন শুরু হয়)  আমি: এই একটু লেবুচা আর ল্যাদ খাচ্ছি। মা: অ্যাঁ! কী খাচ্ছিস? আমি: ল্যাদ, ল্যাদ।  মা: (কীরকম একটা দ্বিধান্বিত গলায়) বুঝতে পারছিনা। (ঘাড় ঘুরিয়ে বাবাকে) টিভিটা কমাও না! সারাদিন চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খবর দেখেই যাচ্ছে! তুমুন একটা নতুন খাবারের নাম বলল, ঠিক করে শুনতেই পেলাম না।  আমি: !!!!!!! মা: (এবার আমার দিকে ফিরে) হ্যাঁ বল।  আমি:  নতুন খাবার আবার কী? বললাম তো ল্যাদ।  মা: ও! আমেরিকান খাবার?  আমি: উফফ এতে আমেরিকান কোত্থেকে এল? আশ্চর্য্য! ল্যাদ জানো না? মা: (খচে গিয়ে) তোরা আজকাল কী খাস কী বলিস আমি বুঝতে পারি না। বিদেশী খাবারের নাম আমি কীকরে জানব?  আমি: বারবার বলছি এটা খাবার না। ল্যাদ। বুঝেছো? লয়ে যফলা আকার - ল্যাদ।  মা: (ভুরু কুঁচকে) মানে? আমি: ল্যাদ মানে ল্যাদ। এইটা না বোঝার কী আছে?  মা: (ভীষণ কাঁইমাই করে) ধুর আমি বুঝতে পারছি না। আমি কি অ...

আলু-থালু

মেয়েটিকে একলা দেখে প্রৌঢ়া সহযাত্রিণী শুধোলেন, তাঁদের পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার ভাগ করে খেতে তার কোনো আপত্তি আছে কীনা। বাড়ী থেকে বানিয়ে আনা গরম খাবার, একেবারেই সাদামাটা; তবে সঙ্গে বাচ্চা ও বয়স্ক মানুষ আছে- তারা প্যান্ট্রির হাবিজাবি খেতে পারেনা। আর স্টেশনে দাঁড়ালেই খুচরো ভাজাভুজি মুখরোচক যা বিক্রি করতে আসে তার গুণমান তো কহতব্য নয়। একা মানুষের অবশ্য রান্না করে আনা ভারী ঝক্কি।    এর আগে মেয়েটিকে নিয়ে একপ্রস্থ আলোচনা হয়েছে ট্রেনের কুপে। ঢলঢলে টিশার্ট আর অনেকগুলো পকেটওয়ালা প্যান্ট, উবুঝুঁটি, মশমশে কেডস, ঢাউস ব্যাগপত্তর, তার ওপর এই দেড়দিনের দীর্ঘ যাত্রায় সঙ্গীহীন - এমন অসৈরণ ব্যাপার তাঁদের ছেলেবেলায় দেখা যেত না। আধুনিক না ছাই! ভয়ডর নেই মনে - সংস্কারের ঘটশ্রাদ্ধ করে ছেড়েছে। আর খাবারেরও বলিহারি - কীসব বার্গার-চিপ্স-আলুভাজা হ্যানাত্যানা! এইজন্যই অমন ঘাড়েগর্দানে একাকার। মেয়েমানুষ নয় একটু ভারী চেহারা হওয়া ভালো, তা বলে এতটা! মেয়েটি হেডফোনের আড়াল থেকে গুঞ্জনের আভাস পেয়েছে, আর করুণায় হেসেছে। সনাতনী আর সেকেলের মধ্যেকার কয়েক যোজন দূরত্ব যারা দেখতে পায়নি, তাদের অভিধ...

আলোকমঞ্জীর

।১। বিনোদিনীর ঘুম ভাঙে ভোরবেলায়। ছোট্টবেলাকার অভ্যেস। গেরামে বেড়ে উঠলে যেমনটি হয়। সেই যে গো, গাঁয়ের নামটি অঞ্জনা আর নদীর নামটি খঞ্জনা। ভাদ্দরমাস পেরোল কি পেরোল না, সেখেনে ভোরের দিকে হিম পড়ে। আর সারারাত ধরে টুপটাপ ঝরে পড়ে শিউলি। তার বুকের কাছটা ভোরের সুয্যির মত টকটকে কমলা। এতো সন কেটে গেল, সেই শিরশিরে হাওয়াটুকু রয়ে গেছে অমলিন। আর আছে বালিকাবেলার কড়ি ও কোমল। বিনোদিনী, আর তার শিউলিফুল পাতানো সই, স্নেহলতা। তাদের কোঁচড় ভর্তি শিশিরভেজা ফুল। ঘাটের কাছে ছলাৎ ছল, গল্প বলে নদীর জল। এমনি সময় নাম না জানা কোনো পাখি ডেকে উঠলেই বিনোদিনীর অবুঝ  মন  উথালপাথাল করে ওঠে...  ।২। নতুন পাড়ায় আসার পর  থেকে ভাবনার একটাও বন্ধু হয়নি। উফ, এরা আবার কীনা পাড়াকে বলে সোসাইটি। ভাবনা ওদের চেয়ে ঢের বেশী ইংলিশ স্টোরিজ পড়ে, তাই বলে কি ওরকম থেমে থেমে বেঙ্গলি বলে? এমা, না না, বেঙ্গলি না, বাংলা। ওদের পাশের ফ্ল্যাটের দিদুন কেমন মিষ্টি মিষ্টি বাংলা বলে, ওর মা তো অমনি বলে না। দিদুন বলে কিনা, মা তোমার ...

অসংলগ্ন

জ্বরের ঘোরে সবকিছু অন্যরকম লাগে। কপাল জুড়ে কাঠকয়লার উনুন। ওমের বদলে ছ্যাঁকা। মর্গের মতো ভয়াল ঠান্ডা হাতপায়ের তালু। লক্ষণ সুবিধের নয়।  ইন্দ্রিয়ের আশেপাশে শেকল পড়ে গ্যাছে। অবসাদের চেয়েও ভারী। বা শান্তিনিকেতনী শাল। আরো ওজনদার। শাল বলতে আবার বনেদী কাঠের কথা মনে আসে। নিরক্ষীয় বর্ষাপ্রবণ অঞ্চলের আদিম মহারণ্য। ঘন, অন্ধকার। কারাগারের কুঠুরির মতো। চেনা আসবাব, দৈনন্দিন ব্যবহার্য সালভাদর দালির চিত্রকল্পের মতো, ধনুষ্টঙ্কারের যন্ত্রণার মতো গলে পড়তে থাকে এঁকেবেঁকে। সাততলার জানলার জাল দিয়ে রাতের নাগরিক আকাশ বা রাজপথ অলস আলকাতরার মতো কালো মনে হয়। ঘর গরম রাখার যন্ত্রে একঘেয়ে আওয়াজ। শ্রুতিনির্বন্ধ। ঝিঁঝির ডাকের মত আচ্ছন্ন লাগে। ঘর্মক্লান্ত গরমের দিনে পুরোনো পাখার আওয়াজে যেমন ঝিম ধরে আসতো। বেসিনে জল পড়ার শব্দ শুনে নোঙর মাস্তুল ডিঙি নৌকার কথা মনে পড়ে। ইন্দ্রনাথের কথা, হাকলবেরি ফিনের কথা, ফটিকচাঁদের কথা। অপক্ক হাতে দিনান্তের সৈকতে তাজা মাছ কেনাবেচার প্যাস্টেল ছবি আঁকার কথা।  খিদিরপুর  ডকে প্রথমবার বাণিজ্যিক জাহাজ...

বীণা ও বাণী

তথাকথিত আস্তিকতা বলতে যা বোঝায়, কোনোকালেই আমার তা ছিল না। আমাদের ঘরে সন্ধ্যেবেলার শাঁখবাতি নেই, নীলষষ্ঠীর উপোস নেই। ভাস্কর্য আর মৃৎশিল্পের নিদর্শন স্বরূপ বুদ্ধ-খৃষ্ট-নানকের মূর্তি সাজানো আছে। প্রাচীন সাহিত্যের অংশ হিসাবে ধর্মগ্রন্থ আছে। দেশবিদেশের সনাতন লোকাচারের ইতিহাস জানবার, এবং যুক্তিহীন বিশ্বাসজনিত আনুগত্যের অভ্যাসকে অতিক্রম করেও তাকে যথাসম্ভব নিরপেক্ষভাবে সম্মান করার শিক্ষাটুকু আছে। আছে হালখাতায় বাংলা বর্ষপঞ্জী সংগ্রহ। চৌকাঠে আর ছাদে হেমন্তের শিরশিরে হাওয়া উপেক্ষা করে দীপাবলির মোমবাতি জ্বালানো আছে। আলো ভাগ করে নেবার আকুলতা আছে, আলোয় ফেরবার আর্তি আছে। আর আছে সরস্বতীপুজো, ঘরকুনো মুখচোরা কিশোরীর একমাত্র আপন উৎসব। সহপাঠিনীর ছোট্ট ফোকলা ভাইবোন, চাঁদা চাইতে এসে বানান বলতে গিয়ে ঘাবড়ে যাওয়া পাড়ার সমিতির ছেলেছোকরা, বা নির্বিবাদী গৃহপরিচারিকার অনভ্যস্ত উচ্চারণে শৈশবেই আমার পিতৃমাতৃদত্ত নামের দৈবী উত্তরণ ঘটেছিল। তারপর আর নিজের সারসত্য সন্ধানে বেরিয়ে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। সেই শুরু আজন্মের সারস্বত সাধনার। আমি চিরকাল কমপ্ল্যান আর আধগ্রাস খিচুড়ি-লাবড়া খেয়ে শূন্যহাতে অঞ্জলি দিয়েছি। সংস...

পাড়া

ঘর-বারান্দা, বাড়ী, পাঁচিলের চৌহদ্দি। ছোটোখাটো বস্তি। সারিসারি জবরদখল হয়ে যাওয়া সরকারী খাসজমি। রেশন, তেলেভাজা-বইখাতা-বাসন আর মনিহারির দোকান, মুদিখানা, বস্ত্রালয়, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। দুবেলা সব্জী আর মাছের অস্থায়ী বাজার। খেলার মাঠ, পার্ক, বাঁধানো রক, ক্লাবঘর। পুরসভা বা পঞ্চায়েতের ব্লকের ভেতরে একখন্ড রাজনৈতিক সংজ্ঞাহীন অঞ্চল, স্বতন্ত্র সভ্যতা। তথাকথিত আত্মীয়তার ঊর্ধ্বে, নিছক পরিচয়ের সূত্রে গড়ে ওঠা স্বাজাত্যবোধ। পাড়া। সবাই সবার খোঁজ রাখে। পথেঘাটে দোকানবাজারে নিতান্ত সাধারণ বারোমাস্যার আদানপ্রদান। ডিগ্রী পাশ বা চাকরির খবরে স্বস্তি আসে, বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে রক্ষণশীল গুঞ্জন ওঠে, সুস্থসবল সন্তানের জন্মে খুশীর হাওয়া বয়। রাতবিরেতে শ্মশানবন্ধু জোগাড় করতে কখনো বেগ পেতে হয় না। সন্ততিত্যজ্য অশীতিপর বৃদ্ধা, কিঞ্চিৎ মানসিক ভারসাম্যহীন অবিবাহিতা প্রৌঢ়া বা বহুজনের সংসারে এককোণে খুদকুঁড়োর মত পড়ে থাকা স্নায়ুরোগাক্রান্ত যুবকের পারিবারিক ইতিহাস ছাপোষা জনজীবনে দুশ্চিন্তা, সহানুভূতি আর অনিশ্চয়তাবোধের সঞ্চার করে। কেউ বাড়ী বিক্রি কর...

টাঙলা

বাংলা শব্দে গোলগাল একটা ব্যাপার আছে। যেমন অক্ষর, তেমনি ধ্বনি। মাত্রা টেনে বর্ণমালা গাঁথবার রীতি দেবনাগরীতেই ছিল। কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত তীক্ষ্ণতার বদলে বাংলা অক্ষরে যা আছে তা হল কোমলতা, স্নিগ্ধতা, শান্ত নিবিড় একটা ভাব। শাপলার ডাঁটা, ফলসার থোক, শালিধানের চিঁড়ে বা কুবোপাখির ডাক ভাবলে যেমনটা হয়। সংস্কৃত শব্দে যুক্তাক্ষরের ঝঙ্কারে আভিজাত্য আছে, দৃপ্ত গৌরব আছে, প্রচ্ছন্ন অহংও বুঝি আছে। বাংলায় সেই যুক্তবর্ণকে বেণীপুতুলের মত-মেটে কুঁজোর মত-কেঠো ঘোড়ার মত গড়েপিটে-ছেঁচে-ডেবে নেওয়া হয়েছে; যাতে ধার কম, স্বরের আধার বেশী। তাই ব-ম-য-ফলায় (যেমন- নিঃস্ব, পদ্ম, সখ্য ইত্যাদি) স্বতন্ত্র বর্ণের আঘাতের বদলে দ্বিত্বব্যঞ্জনে জিভকে আরাম দেবার একটা আলসে চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। আলসে অবশ্য কোঠাবাড়ির ছাদেরও হয়, যেখানে নুনহলুদ ছোপ ফুলছাপা শাড়ির পাশে আচারের বয়াম ঝিমোয়। যেমন অক্ষর, তেমনি ধ্বনি। এঁটেল মাটির মত ভিজে ভিজে, হেঁটে গেলে যাতে পদচিহ্ন পড়ে। তার ওপর দিয়ে ধুলো উড়িয়ে টগবগিয়ে ঘোড়সওয়ার যায় না, পদাতিক কাহারের কাঁধে পালকি যায় দুলকি চালে। তা বলে কি একেবারেই তেজ ন...

Rants in the days of COVID-19, অথবা নোটাপন্থীর নকশা

-inspired by the 'Love in the days of cholera' by Gabriel Garcia Marquez  গ্যাবো লিখেছিলেন এস্প্যানিওলে। বিশ্বশুদ্ধু লোকে পড়তে পারবে, এই বেয়াক্কেলে ভ্রান্তিতে ইংরেজীতে লেখেননি। কালজয়ী সাহিত্য যা লেখা হয়েছে অদ্যবধি, তার কিয়দংশই ইংরেজীতে। স্বাভাবিক। যে বিশ্বজনীন, তার শেকড় নেই, তাই প্রাণও নেই। অবশ্য প্রাণ আর নিষ্প্রাণ, জীব আর জড়ের মধ্যবর্তী যে ভাইরাস- তা-ই একবিংশ শতাব্দীতে বিবর্তনের শেষধাপ মানবজাতির ভিত ও জিন - উভয়ই কাঁপিয়ে দিয়েছে।   আপাতত করোনাভাইরাসের ভয়ে ইশকুলকলেজ সব বন্ধ। আন্তর্জাল ভরসা। করোনা অর্থে লাতিনে মুকুট, আকৃতিগত সাদৃশ্যের কারণে এই নাম। শেষের শুরু হয়েছিল চীনের উহান প্রদেশে, সেখানে তা মহামারীর আকার ধারণ করেছে এখন। আক্রান্ত হয়েছে প্রতিবেশী দেশ, এবং বিচ্ছিন্নভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত। যিনি প্রশাসনকে সাবধান করেছিলেন প্রথম, রাষ্ট্রের বিরোধিতার অভিযোগে মহান কম্যুনিস্ট সরকার তাকে দণ্ড দেয়। তারপর যা হয়, প্রকৃতির শাপ যায় না বিফলে, দাবানলের মত বিধ্বংসী সে রোগ ছড়িয়ে পড়ল। সেই ভদ্রলোক দেহ রাখলেন, মানুষ প্রতিবাদ করার বিক্ষোভ দ...